মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ছাগলনাইয়া উপজেলার ভাষা ও সংস্কৃতি

তথ্য সংগ্রহঃ http://www.chhagalnaiyainfo.com
ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তারীত জানতে ......


ভাষা

 

 

ভাষা :

বাংলাদেশ মোটামুটিভাবে একই জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত জনপদ হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিক রীতিনীতি প্রচলিত আছে, সে সংগে আঞ্চলিক কথ্য ভাষা ও উচ্চারণ ভঙ্গি রয়েছে।শিক্ষিত হোক আর অশিক্ষিত হোক সব ধরণের লোকের কথা বার্তায় আঞ্চলিক ভাষা ও উচ্চারণের একটা প্রবণতা থাকে।ফেনী তথা ছাগলনাইয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর আরবী, ফার্সী ও পশ্‌তু শব্দ প্রচলিত রয়েছে।এখানকার কথ্য ভাষায় এমন অনেক শব্দ প্রচলিত আছে যা বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের লোকেরা সহজে বুঝতে পারে না।স্থানীয় বহুল প্রচলিত কিছু কথ্য ভাষা হলো : হোলা (ছেলে), মাইয়া (মেয়ে), ছালন (পাক করা তরকারী), সুরবা (তরকারীর ঝোল), ঘরবা (মেহমান), হোঁয়া (শসা), হউর ( শ্বশুর), আঁই (আমি), তুঁই (তুমি), হেতে (সে), হুব (পূর্ব), হইর (পুকুর), হক্কানে (সামনে), ওঁচে (উপরে), এক্কেনা (একটু), কন্ডে (কোথায়), রাঁই (বিধবা), হেগুন (তাহারা), হইক (পাখি), কিল্লাই (কেন), বিছইন (হাত পাখা), বাইয়্যুন (বেগুন) ইত্যাদি। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত ছাগলনাইয়ার মানুষের মধ্যেনানা ধরণের আদি লোকাচার বা সংস্কার, শুভ-অশুভ বিশ্বাস এখনো প্রচলিত রয়েছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ছাগলনাইয়ারমানুষের সামাজিক মূল্যবোধেরও পরিবর্তন হয়েছে।

 

সংস্কৃতি

আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক- ভৌগোলিক বহুবিধ অনুষঙ্গের কারণে অঞ্চল ভেদে সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা রুপ পরিলক্ষিত হয়।তাই একটি দেশের সামগ্রিক লোকসংস্কৃতি এবং একটি বিশেষঅঞ্চলের লোকসংস্কৃতিতেও অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।ছাগলনাইয়া উপজেলা প্রাচীন সমতল জনপদের একাংশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই উপজেলার লোকসংস্কৃতিতেও তার একটি পরিছন্ন রুপরেখাপরিলক্ষিত হয়। বহু ভাঙ্গা-গড়া, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের ছাগলনাইয়া যা এক সময় সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধ জনপদ ছিল।এ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির প্রতি একটু ঘনিষ্ট হলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, এ অঞ্চলের একটি সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির পরিমন্ডল রয়েছে।লোকসংস্কৃতির একটি প্রধানতম শাখা লোকসাহিত্য। ছাগলনাইয়ার লোকসাহিত্য এ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকটাসমৃদ্ধ এবং জীবনঘনিষ্ঠ; তা এ অঞ্চলের প্রবাদ-প্রবচন, আঞ্চলিক গান, ধাঁ-ধাঁ, ছড়া থেকে সহজেই অনুমান করা যায়।নিম্নের আলোচনায় এর স্বরুপ কিছুটা উম্মোচিত হবে।

প্রবচনের কথাই ধরা যাকঃ “মাইনষের কুডুম আইলে গেলে, গরুর কুডুম লেইলে হুঁইছলে” এ প্রবচনটি অর্থ হলো মানুষেরকুটুম্বিতা তথা আতিথেয়তা বুঝা যায় পরস্পরের আসা যাওয়ার মাধ্যমে আর গরুর তা বোঝা যায় লেহনের মাধ্যমে।এ প্রবচনের অর্থের সাথে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যে ঐতিহ্যগতভাবেই আত্মীয়বৎসল তা বুঝতে বাকী থাকার কথা নয়। “ ঝি থাইকলে জামাইর আদর, ধান থাইকলে উডানের আদর ”- এ প্রবচনটির সরল অর্থ হচ্ছে কন্যার কারণেই মানুষ কন্যাজামাতাকে খাতির করে আর ধান প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজনীয়তা হেতুই মানুষ উঠানের যত্ন করে।

কিন্তু এসব প্রবচনের মূলে যে সুক্ষ্ম দার্শনিক দিক রয়েছে তা কি আমরা ভেবে দেখার অবকাশ পাই? “মাছ ধোঅন হিঁডা, গোস্ত দোঅন মিডা” এ প্রবচনের মধ্য দিয়ে নবীন কোন রাঁধুনীকে শেখানোর চেষ্টা করা হয় যে, রান্নার আগে মাছটা খুব ভালোভাবে ধুতে হয় এবং মাংসটা অপেক্ষাকৃত কম ধুতে হবে।সাধারণ গার্হস্থ্য শিক্ষা ছাড়াও এ প্রবচন এটাই প্রমাণ করে যে, এ অঞ্চলের মানুষ সুদীর্ঘ সময় ধরেই মাছ, মাংস খেয়ে অভ্যস্থ। “না হাইত্তে খায় হুঁনি, না হাইত্তে করে চুরি” এ প্রবচনের শিক্ষা হচ্ছে পারতপক্ষে মানুষঅসম্মানজনক কাজ করে না এবং সংরক্ষিত খাবার খায় না। মাছের সংকট বলেই মানুষ যেমন বাধ্য হয়েই শুটকি খায় তেমনিনিতান্ত বাধ্য হয় বলেই মানুষ চুরি করে। দার্শনিক এ শিক্ষার পাশাপাশি এ প্রবচনে চাটগাঁর মত শুটকি যে এ অঞ্চলেরনৈমিত্তিক খাবার নয় তাও কিন্তু বুঝতে কষ্ট হয় না। এমনি “ হৈল হোনা গজার হোনা, যার যার হোনা তার তার হোনা” এ প্রবচনে সন্তান বাৎসল্যের সাথেসাথে আত্মমুখী ভালোবাসার মজ্জাগত বোধটি সরলভাবেই বিধৃত হয়। শোল মাছ, গজার মাছ যেগুলি কিনা রাক্ষুসে মাছ, যারা অন্য মাছের পোনা অবলীলায় খেয়ে সাবাড় করে। কিন্তু তারা নিজ নিজ পোনাকেসোনা যেমন মূল্যবান ধাতু হিসেবে মানুষ আগলে রাখে তেমনি আগলে রাখে। উপরিউক্ত প্রবচন গুলোর মত হাজারো প্রবচনএখানকার লোকমুখে প্রতিনিয়তই ব্যবহৃত। শুধু আমরা তা মনোযোগী হয়ে আমলে নিইনি, নেইনা। আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রেযদি একটু দৃষ্টি রাখি তাহলে দেখা যাবে, প্রতিটি গানের মাঝেই এ অঞ্চলের নিজস্ব সত্তার প্রকাশ ঘটছে। আঞ্চলিক গানেরকথা বলছি এ কারণে যে, লোকগীতি বললে তা আমাদের উপজেলা-জেলা ছাড়িয়ে পুরো ভাটিঅঞ্চলকে যুক্ত করে ফেলে। তবে ভাটিয়ালীগানে যে এ উপজেলার-জেলার মৌলিকত্ব নেই তা নয়। ভাটিয়ালী গান-গীতির ভৌগোলিক সীমা অনেক বেশি প্রসারিত। কাজেই একটিছোট অঞ্চলের গানই বোধ হয় প্রাধান্য পাওয়া প্রয়োজন। এ অঞ্চলের আঞ্চলিক গান ও শ্লোক যা ছাগলনাইয়ার গ্রামে-গঞ্জেএখনো দারিদ্র পীড়িত অধিকার বঞ্চিত মানুষকে ক্ষণিকের আয়েসী-আড্ডায় বুদ্ধিদীপ্ত ও চিন্তামগ্ন করে কিংবা কিঞ্চিতবিনোদিত করে এগুলোও তারই প্রমাণ।

“আঁডে গুড় গুড়, ছাঁড়ে মাডি ছ চোক তিন হুগুডি” -এ ধাঁ-ধাঁ টির উত্তর হলো হাল বা লাঙ্গল চালানো।জীবনের প্রত্যাহিকতাকে রসসিক্ত উপস্হাপন করার ক্ষেত্রে আমাদের নিরক্ষর পুর্বসুরীরা যে মোটেই অদক্ষ ছিলেন না, এ ধাঁ-ধাঁ তারই উৎকৃষ্ট প্রমাণ। “আইষ্টে ঠেং হোল আঁডু, তার নাম রাম টাডু, মাছ ধইত্তে যায়রে টাড়ু, হুউনাত মেলি জাল, মাছ খায় চিরকাল” মাকড়শাকে নিয়ে রচিত এ ধাঁ-ধাঁ আট পা বিশিষ্ট এ জীবের জীবন সমীক্ষণে যে গভীর পর্যবেক্ষণেরপরিচয় ফুটে উঠে তাতে আমাদের পুর্বসুরীদের মেধার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবনতই হতে হয়। এরকম “ উডান ঠন ঠন হিঁড়াত বাড়ী, ধলা হিরিসতার হোন্দে দাঁড়ি ”। “ কেরে ভাই চৈতি রাঙ্গা, গাছের আগাত হৈল হো'না”। “ বনের তোন্ বার অইল ভুতি, ভাত বেড়াই দিল মুতি ” যথাক্রমে- রসুন, খেজুর, লেবু।

ফল ফসল সংক্রান্ত ধাঁধা ছাড়াও প্রত্যাহিক জীবনের নানা উপকরণনিয়ে রয়েছে হাজারো বৃদ্ধিদীপ্ত মুখরোচক ধাঁধাঁ।এছাড়াও বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকেনিয়ে দেখা যায় শতশত ছড়া, পদ-পদ্য এমনি প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক একটি বিয়ের অনুষ্ঠানেব্যবহৃত ছড়া হচ্ছে-আচ্ছালামালাইকুম তালতোভাই, দুলা আইছে বিয়া কইত্তো আন্নেরা আইছেন কিল্লাই। উত্তরে-“ওআলাইকুম আচ্ছালাম অবা, দুলা আইছে বিয়া কইত্তো আন্ডা আইছি লোইগ্যা”। রয়েছে ছেলে ভুলানো ছড়া-“ঝিঁঅ ঝিঁঅ মাগো/ নেঁওলা খাইতাম গেলামগো/কাঁডা হুঁড়ি মইল্যাম গো/ কাঁডায় লইল শুলানী/ বুড়িয়ে দিল দুয়ানি “। এ সকল ছড়া থেকে এটা সহজেই বুঝা যায় যে, এ অঞ্চলের ঐতিহ্যগতভাবেই রসপ্রিয় এবং তাদের রসবোধ জীবনঘনিষ্ঠএবং একান্ত নিজেদেরই মত। আজকের আকাশসংস্কৃতির বদৌলতে আমরা বহু বিষয়েই বিস্তৃত হচ্ছি। যাত্রা, পালাগান এসবই আজ সেকেলে ও অনাধুনিক।কিন্তু সেল্যুলয়েডে বন্দী জীবনাংশের তুলনায় এ অঞ্চলেরনট-নটীদের নান্দনিক উপস্থাপনায় এখনো গ্রামে-গঞ্জেমানুষকে পুরোরাত জেগে যাত্রা-পালা শুনতে কম বেশি দেখা যায়বৈকি। লোক-সাহিত্যের কথা বাদ দিলেও এ অঞ্চলেরজনজীবনে যে ঐতিহ্য লালিত তার শিল্প বোধ ঈর্ষণীয় বলতে হবে। আপনিযদি নাগরিক সংস্কৃতির বলয় থেকে বেরিয়ে গ্রামে ঘুরেতে যান, আতিথ্য গ্রহণ করেন, আপনার দৃষ্টিতে গ্রাম্য কোন মানুষেরআতিথ্যে মুগ্ধ হবেনই।শুরু থেকে ফেরা পযন্ত আপনি পাবেন নানা ঐতিহ্যের স্বাক্ষর।দেখবেন আপনাকে বসার জন্য যে পাটি বাবিছানা দেয়া হয়েছে তাতে রয়েছে যত্নে বোনা কারুকর্ম। হয়তো তারইওপর বিছিয়ে দেয়া হয়েছে একখানা চাদর; যাতে যত্নে করা সুঁচিশিল্প কিংবা এককোণে সুঁই সুতায় আঁকাবিচিত্র বনফুল আপনাকে আকৃষ্ট করবে। ক্ষণিকেরজন্য আপনি হয়তো ভাববেন বাহ্ বেশতো! আমাদের মায়েদের-মেয়েদেরঐতিহ্যগত শিল্পবোধ আপনাকে আলোড়িত করবে। হয়তোকেবল পাটালী গুড় আর শুকনো মুড়িই দেয়া হলো আপনাকেতাৎক্ষণিকভাবে; দেখবেন যে টুকরিতে বা সাজিতে যা দেয়া হবে তাতেরয়েছে নিপুণ কারুকাজ খঁচিত। ধাতব পানদানে কিংবা বেত, আঁতি, সুতো ইত্যাদি সমন্বয়ে বানানো পানদানে আপনাকে দেয়া হবে পান।দৃষ্টি থাকলে আপনি খুঁজে পাবেন আমাদের হাজারো বছরের লালিতঐতিহ্য। লাঙ্গল-জোয়াল, কোদাল-কাস্তে, টুকরি-সাজি, যেটারদিকেই তাকান না কেন আমাদের ঐতিহ্যগত শিল্পরসের একটি নমুনাআপনাকে আকৃষ্ট করবেই। উপরোক্ত বিষয়গুলো পযালোচনা করলে ইহাইপ্রতিয়মান হয় যে, আমাদের চারু ও কারুকলা দু'ই সংস্কৃতির পরিচয়দেয়। আর এ পরিচয়ের দিক থেকে আমাদের লোক ঐতিহ্যলোকসংস্কৃতি হাজারো বছরের